এই সময়ের লেখালেখি ৥ সাগর আল হেলাল

এই সময়ের লেখালেখি

৥ সাগর আল হেলাল

ভূমিকাঃ

নক্ষত্রের উদয় নেই, নেই অস্ত। অথচ আমরা সূর্যের উদয় অস্ত দেখে থাকি। দেখি চাঁদের নিদ্রা ও জেগে ওঠা। সূর্য পূর্বে ওঠে অস্তে পশ্চিমে। আর চাঁদ পশ্চিম থেকে পশ্চিমে। এসব বলার কারণ হলো- সূর্যের উদয়-অস্ত না থাকলেও আমাদের মস্তিষ্কে ওটা একটা প্রোগ্রামিং আকারে বিদ্যমান। আমরা তাকে অস্বীকার করে কলম চালালে, পাঠক আপনাকে ক্ষমা করবেন কেনো। তার মস্তিষ্কওতো প্রোগ্রামিং হয়ে আছে। তাছাড়া বিজ্ঞানের তেমন কোনো পাঠ আমাদের সামনে এখনো অনপস্থিত। জীবন উত্থান এবং পতন, দিন এবং রাত্রি, আলো এবং অন্ধকার এভাবেই অতিক্রম হচ্ছে অনাদিকাল। তার ব্যতিক্রম করলে সে সমুচিত সাড়া দেবে কি ! এই সময়ের লেখালেখিতে পাঠকের সাড়া খুবই সীমিত হয়তো সে কারণেই। লেখার মধ্যে পাঠক তার নিজেকে খুঁজে পায় না। পাঠকের আবেগ-অনুভূতি, চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনার কথা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয় না বলেই লেখার সাথে তার নিজের সংশ্লিষ্টতা হারিয়ে ফেলছে। আর লেখকরা ? পাঠকের কোমল মন-মননের কথা চিন্তা না করেই অহেতুক পাঠককে দোষারোপ করে নিজের ইচ্ছায় অথবা চাপে পড়ে কলম চালিয়ে যান লেখক। সময়ের পরিবর্তনে এক সময় দেখা যায় লেখক নিজেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন এবং অকালে ঝরে যান। এভাবেই অনেক প্রতিভাধর লেখককে আমরা হারিয়ে ফেলেছি। আমার আজকের যতো কথা এসব নিয়েই। আশা করি সাথে থাকবেন।

পেছনের কথাঃ

মেঘের জল বিনে চাতক পান করে না জল। সুতরাং তার জীবন মেঘের সাথে সম্পৃক্ত। যেখানে বছরের পর বছর বৃষ্টি হয় না, সেখানে নিশ্চয়ই চাতক পাখি নেই। দিন-রাত, আলো-আঁধার প্রকৃতির দান। এ দান অস্বীকার করে জীবন নির্বাহ অসম্ভব। একাধারে ৬মাস দিন এবং ৬মাস রাত আমাদের প্রকৃতি ধারণ করে না। যদি তেমন হয় তাহলে সেটা হবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বাতাস দিক বদল করে, সূর্যের আলো দেয়ার ক্ষমতা বাড়ে-কমে। প্রকৃতি দুটি মাসের অধিক একটা ঋতুকে ধারণ করে না। ঋতু বৈচিত্র বিঘ্নিত হলে জীবন বিপন্ন হয়, মানুষ দৈনন্দিন কাজ-কর্মের ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলে। কারণ সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়েই জীবনের রুটিন পরিবর্তিত হয়। অবস্থানের ক্ষেত্র পরিবর্তন হয়। চাকরীজীবিদের প্রোমাশেন ট্রান্সফার হয়। থানার ওসি, জেলার ডিসি, বিভাগের কমিশনার পরিবর্তন হয় ৩ বছর পর। বিচারপতি যায় আসে, আসে-যায় সেনাবাহিনীর প্রধান। ট্যালেন্ট মানুষের নিকট থেকে এভাবেই সেবা আদায় করা হয়। পরিবর্তন হচ্ছে না শুধু একটি জায়গায়। ফলাফলের নিচের কোনো পরিবর্তনে পরিবেশ, পরিস্থিতি, সেবার মানের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। আমরা একটি মাত্র ঋতুসময়ে বন্দী হয়ে আছি।

যে কারণে এতো কথাঃ

লেখালেখির মাধ্যম ছিলো সংবাদপত্র। সংবাদ কর্মীরা অনেক কথা বলার অধিকার সংরক্ষণ করতেন। সাহিত্যিকগণ রূপকের সাহায্য নিয়ে তারাও নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতেন। কিন্তু আমরা যে সময়টা অতিক্রম করছি, এই সময়ে সাংবাদিকরা সেই অধিকার হারিয়েছে, হারিয়েছে সাহিত্যিকগণও। জীবন জীবিকার তাগিদে ইচ্ছা/অনিচ্ছায় সাহিত্যিক-সাংবাদিকরা সাময়িক গা বাঁচিয়ে লিখতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু এই সাময়িক সময়টা সময়কালে পরিণত হয়েছে। জগদ্দল পাথরের মতো চেপে আছে অদৃশ্য চাপ, এ যেনো অনন্ত চাপ। ফলে সাহিত্যিক-সাংবাদিকবৃন্দ একটা প্রোগ্রামিংয়ের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে গেছে। তাদের মস্তিষ্ক এখন আর মুক্ত হতে পারছে না। দীর্ঘ ৫০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও আমাদের দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে নি। আদালত, প্রশাসনিক দপ্তর, আইন শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থায় একই স্থান থেকে আদেশ-নির্দেশ আসছে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছর এবং যুগ অতিক্রান্ত হওয়ার পরও। ভিন্নমতাবলম্বীদের স্থান নেই এখানে। প্রোগ্রামিংয়ের মধ্যে থাকা সাংবাদিক-সাহিত্যিক নিজেদের বর্তমান অস্তিত্বের এতোটাই অধীন হয়েছে যে, তারাও ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারছে না আজকাল।

দেশে অনেক মেগা উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। আপনি বলবেন কেনো, আমিই বলছি। জানেনতো, পলি জমলে ফসল ভালো জন্মে, কিন্তু বেশি পলি জমলে নদী ভরাট হয়ে যায়। নদী ভরাট হলে প্লাবন আসে, তাতে ঘরের সংরক্ষিত সম্পদও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আমাদের কি হবে কেউ কি জানি! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে এখন চলছে ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ। হিন্দু বনাম মুসলিম প্রসংগ ঠাণ্ডা হলে, শুরু হয়ে যায় মৌলবাদী মুসলিম বনাম মডারেট মুসলিম। বোরকা-স্কার্ফ উপরি। রাজাকারের বংশ ফাঁসী দেওয়াটা ভুল হয়ে গেছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেন। ওটা একটা শক্ত ডিবেটের স্থান জুড়ে ছিলো। আরও আছে আস্তিক-নাস্তিক প্রসংগ। হলুদ পতাকার মিছিলও হয়েছে শাহাবাগে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর বেশি কিছু আশা করতে পারবেন না। নিতান্তই বিবেকের দংশনে কেউ যদি প্রোগ্রামিংয়ের বাইরে এসে কিছু বলেই ফেলে, সংগে সংগে তাকে এমন অপদস্ত করা হয়- মাস খানেক হয়তো সে আর মিডিয়াতেই আসে না। একটি নির্দিষ্ঠ সময়কালকে ধরে রেখে সব কিছু করা হচ্ছে। সময়কে সচল করা আশু প্রয়োজন।

মূল ও শেষ কথাঃ

টু হেড ইজ বেটা দ্যান ওয়ান। গণতান্ত্রিক দেশে এই দুই হেড হলো সংসদীয় নেত আর সংসদীয় বিরোধী দলীয় নেতা। জাতীয় ইস্যুতে যৌক্তিক ডিবেটের মাধ্যমে জাতীয় জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়িত হবে, এটাইতো হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কোন দানবীয় শক্তির কবলে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা ! আত্ম উপলব্ধি করার সময় এসেছে। একটু ভাবুন। নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করুন। তা না হলে এই সময়চক্রের সাথে আপনিও দাফন হয়ে যাবেন। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।

-

০৭.০৯.২০২২

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ