ফুল ফুটে ঝরে যায়
সাগর আল হেলাল
মানুষ মরে গেলে নাকি তারা হয়ে যায়। গ্রামের বাড়ির বারান্দায় বসে আলোকিত আকাশ দেখি। আজকের আকাশ কি আগের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল? বাংলা সাহিত্যের কনিষ্ঠ এক নক্ষত্র তারাদের দেশে পাড়ি জমিয়েছে। কোন তারাটা মির্জা তাহের জামিল? চোখ ভিজে আসে। তারাগুলো অনেক বড়ো বড়ো দেখায় জলের লেন্সে। মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। গ্রীলে হাত রেখে চেয়ারে হেলান দিই। একটা দীর্ঘশ্বাস চোখের জল শুকানোর চেষ্টা করে। তারাগুলো সরে যায়, দূরে। বহুদূরে। আচ্ছা, আমি মরে গিয়ে কি তারা হতে পারবো? তারার দেশে কি সাহিত্য আসর বসে? রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল উনারা কি তারা হতে পেরেছেন? মানুষ মরে গিয়ে মুক্ত হয় শুনেছি। শুনেছি মুক্ত মানুষ যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারে। ফুল হয়ে হাসতে পারে, শিশির হয়ে ঘাসের ডগায় নাচতে পারে। কসমিক এনার্জি হয়ে ভ্রমণ করতে পারে মহাবিশ্ব, নক্ষত্রলোকে।
মির্জা তাহের জামিল এক কনিষ্ঠ নক্ষত্র
মির্জা তাহের জামিল সম্পর্কে লিখতে গেলে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে যাই, যা অনেকেরই পছন্দ নয়। এর মধ্যে একজনের বকাও শুনেছি। মির্জার সাথে চাঁদ ও একটি শিশুর মধ্যে যেমন সম্পর্ক, তেমন সম্পর্ক ছিলো আমার। ও ছিলো চাঁদের মতো। হঠাৎ আসতো, জয় করতো তারপর আবার নিরুদ্দেশ হয়ে যেতো। চাঁদকে ঘিরে শিশুর কতো কল্পনা, কতো স্বপ্ন সে কথা কি চাঁদ কোনোদিনও জানতে পারে? ও মরে গিয়ে সে কথাই প্রমাণ করে গেলো। বয়স হিসেবে আমার আগে যাওয়ার কথা। আমি মরে গেলে ও আমার সম্পর্কে কিছু লেখা দূরে থাক, হয়তো আমার মৃত্যু খবরই জানতে পারতো না। অথচ চাঁদকে ঘিরে শিশুর ভাবনার মতোই আজ আমি ওকে নিয়ে লিখতে বসেছি।
হন্তদন্ত হাটতো মির্জা তাহের জামিল। ও আমার বন্ধু কম ছোটো ভাইয়ের মতো ছিলো বেশি। বয়সে ছোটো। কিন্তু কথা বলতো সব রকমের। আমিই বরং একটু সাবধান থাকতাম। ওকে বুঝতে দিতাম না যে, ওকে শুধু ভালোবাসিনে- ¯েœহও করি। আমার বড়ো ভাইয়ের ছোটো মায়ের বড়ো ছেলে আমি। মির্জাও এমনই। আমি কোনোদিন প্রকাশ করি নি। আমার পিঠে একটা ভাই মারা যায় ভুমিষ্ঠের পর, অল্প দিনেই। মির্জার কোনো ছোটো ভাই আছে সে কথা তখন জানতাম না। ও-ও কোনোদিন বলে নি। আমি ছোটো বেলাতেই বাবা হারাই। ওকে দেখে, ওর মধ্যে নিজেকে খুঁজতাম। আমাকে অগ্রসর হতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। ওর বেলায়ও যে এমনটি হতে পারে, সেটা আমি ধরেই নিয়েছিলাম। ফলে সম্পর্কটার প্রতি আমার খুব যত্ন ছিলো। এই যত্নটা যখন কাছে পেয়েছি, তখনই না করতে পেরেছি! আমি এক পরাজিত মানুষ, মির্জাও কি তেমনই ছিলো! তবে আমি সবার সাথে থাকতে চাই, ও বেছে নিয়েছিলো নিঃসঙ্গের পথ। এটাই দুঃখ। মরতে তো একদিন সবারই হবে। তাই বলে এভাবে? ওর মধ্যে আমাকে দেখতাম আমি। তবে কি ও আমাকে আমার পরিণতিটাই দেখিয়ে গেলো!
কতোজনেইতো লেখালেখি করে। লিখতে লিখতে হারিয়ে যায় অনেকেই। সবাই কি কবি বা লেখক হতে পারে! এটা একটা আত্মতৃপ্তির বিষয় বলে মনে করি আমি। আর তাই ভালো লিখতে না পারলেও লিখে যাই। নিজের মনের ভাবটাতো কলমের কালিতে চোখের সামনে চেয়ে দেখতে পারি। মির্জাকে আমি সে কথাই বলতাম। কিন্তু লেখালেখি করে বিরাট অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে, এমন কথা ছিলো জামিলের। ওকে লেখার চাপ দিলে বলতো- অতো লিখে কি হবে? ওসব আজেবাজে লেখা আপনেরাই লেখেন গা। লেখা নিয়ে খুব ভাবতো সে, এমনই বলতো। বাংলা একাডেমির প্রশিক্ষণ এর পেছনে কাজ করেছে হয়তো। লেখালেখিতে অনেক রকম দাবী করতো ও। আমি বলতাম- এগুলো সত্যি হলে আমি অনেক খুশি হবো। হাসতে হাসতে বলতো- রেডি থাইকেন, আপনাকে আমার সাথে রাখবো, চাকরী দিয়ে। আমার চাকরী, বেতন ওর মন ভরাতে পারতো না।
একবারের ঘটনা। সম্ভবত ১৯৮৬/৮৭ সাল। একদিন আমার মন খারাপ দেখে কারণ জানতে চাইলো মির্জা। আমি বললাম- তেমন কিছু না। ওতো নাছোড়। বলতেই হবে। অগত্যা বলতেই হলো পুরো ঘটনা। গীতিকার হওয়ার জন্য রাজশাহী বেতারে গান পাঠিয়েছিলাম। বেতার থেকে চিঠি দেয়া হয়েছে ৫(পাঁচ)টি গান ওরা কিনে নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী আবার নতুন করে ২৫(পঁচিশ)টা গান জমা দিতে হবে। ৫(পাঁচ)টি গানের জন্য ৫০/- (পঞ্চাশ মাত্র) টাকার একটি চেকও পাঠিয়েছে। বিষয়টা সেই সময়ে আমাদের সিনিয়র শ. ই শিবলি ভাইয়ের সাথে শেয়ার করলে তিনি একটি অনাকাক্সিক্ষত মন্তব্য করেন। সঙ্গত কারণেই মন্তব্যটা উল্লেখ করলাম না। সেই বড়ো ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই। পুরো ঘটনা শুনে মির্জাতো হাসতে হাসতে এক রা। আমি তাজ্জব। বিষয়টা কি? ওর হাসি যেনো থামতেই চায় না। এক পর্যায়ে বললো- আপনি জানেন নাতো। শিবলি ভাই আর মনোয়ার হোসেন জাহেদী স্যার বেতারে একাধিকবার গান জমা দিয়েও সাকসেস হতে পারেন নি। এটা সেই হতাশারই বহিঃপ্রকাশ। সত্য-মিথ্যা আমি জানি না, তবে আমার মন ভালো হয়ে যায়। সে গান আদর্শ গার্লস স্কুলের তৎকালীন শিক্ষিকা ফাতেমা আপা ও আবুল কাশেম গেয়েছিলেন রাজশাহী বেতারে।
পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়ি। দেয়ালিকা লিখি। বিশেষ দিবসে ম্যাগাজিন প্রকাশের চেষ্টা করি। মির্জা তাহের জামিলের সাথে পরিচয় সেই সময়। আরও অনেকের সাথে পরিচয় হয়। সে সময় বাংলা ক্লাসে স্যারেরা বিভিন্ন বইয়ের রেফারেন্স দিয়ে সেগুলো পড়তে বলতেন। বাংলা বিষয়ে আমার প্রিয় স্যার ছিলেন মোহাম্মদ কামরুজ্জামান স্যার। রেফারেন্স দেয়া আরম্ভ করলে থামতেই চাইতেন না। মাথায় লেখালেখির পোকা থাকায় কলেজ লাইব্রেরি ছাড়াও অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরিতে যেতেই হতো। কার লেখা কয়খান বই, কে কে পড়েছে সেটা নিয়ে প্রতিযোগিতা হতো। উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণিতে আজকাল ওসবের বালাই নেই। পাঠ্যপুস্তকের বাইরের কোনো বই এখনের শিক্ষার্থীরা ছুঁয়ে দেখে কি? তবে পাশের হার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। বর্তমানের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি ট্যালেন্ট বৈকি! আমি যে বছর উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করি, সে বছর পাশের হার ছিলো ২৮%। ৫৩.৭% নম্বর নিয়েও কমার্স থেকে আমি বৃত্তি লাভ করেছিলাম। কলেজ, লাইব্রেরি, আড্ডা ইত্যাদি সেরে গ্রামে ফিরতে দেরি হতো বলে মেসে উঠলাম, গোপালপুরে। তারপর থেকে জমে উঠেছিলো আমাদের ক্রিয়াকর্ম। দিনশেষে পাবলিক লাইব্রেরি, টাউন হল মাঠে আড্ডা দিয়ে মির্জা যেতো শালগাড়ীয়ায়। আমি রয়ে যেতাম গোপালপুর মহিলা কলেজের পাশে।
সরকারী পাবলিক লাইব্রেরি ছিলো নতুন ব্রীজের এপাড়ে ট্রাফিক মোড়ের কাছেই। এখানের আড্ডাটা ছিলো নৈমিত্তিক। কোথাও দেখা না হলে, এখানে সাক্ষাত হতোই। লাইব্রেরিয়ান ছিলেন খুবই আন্তরিক। নতুন কিছু এলেই, জানিয়ে দিতো। আমাকে পড়ালেখার পাশাপাশি কাজ করতে হতো। আমি লেটার প্রেসের কম্পোজিটরের কাজ করতাম। সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের সাথে জড়িত থাকায় শিখে গিয়েছিলাম। থানার পাশে হাজীর প্রেসে কাজ করেছি বেশি। কারণ, ওখান থেকে ২টা পত্রিকাও প্রকাশ হতো। মাসিক মৌটুসী ও সাপ্তাহিক দূরদৃষ্টি। সাপ্তাহিক পাবনা বার্তার অফিসও তখন ঐ এলাকাতেই ছিলো। আর তাঁতী মার্কেটের দোতলায় ছিলো ইসলামের কুরিয়ারের অফিস। আব্দুল হামিদ রোড ছিলো আমাদের বাড়ি-ঘর-উঠোনের মতো।
আমি রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর মির্জা তথা পাবনার সাহিত্যাঙ্গনের সাথে যোগাযোগ থেমে যায়। রাজশাহী থেকে ফিরে চলে যাই ঢাকায়। আর যোগাযোগ হয় না মির্জার সাথে। তখনতো মোবাইলও ছিলো না। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে চাকরী করি। মির্জা উপস্থিত হঠাৎ একদিন। বাংলা একাডেমিতে লেখক সৃষ্টি প্রশিক্ষণ প্রকল্পে ভর্তি হয়ে কিছুদিন ছিলো আমার কাছে আগারগাঁয়ে। তারপর নিরুদ্দেশ। ওর পাবনায় ফেরার আগে, আর আমার সাথে সাক্ষাত হয় নি। জানতে পারি প্রশিক্ষণের পর বাংলা একাডেমি থেকে ওর বই প্রকাশ হয়েছে। একটা চাকরীও পেয়েছে ঢাকাতে। ভালো আছে জেনে খুশি থাকি।
পরের দেখা অনেক পরে। প্রায় ১৫/১৬ বছর পরে। কেনো জানি ওকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে যাই আমি। ওদের শালগাড়ীয়ার বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়েছে। ওদের বাসার আশ-পাশটাও পরিবর্তন হয়ে গেছে। চেনা মুশকিল। তবুও সাহস করে এগিয়ে যাই। যেই প্লটে ওদের বাড়ি ছিলো, অনুমান করে সেই প্লটের শেষ প্রান্তের বাসায় যাই। মির্জার ফোন নম্বর পাই। ওটা ছিলো মির্জার এক ভাইয়ের বাসা। পুনরায় যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ঐদিনই সাক্ষাত হয়েছিলো বিকেলে। ইসলামের তাঁতী মার্কেটের গেটে ইসলামহীন বৃষ্টির বিকেলে। রাস্তা পাড় হয়ে ট্রাফিক মোড় ছাড়িয়ে ভেতরের এক চা স্টলে বসালো আমায়। উচ্ছ্বসিতভাবে বললো- আমি চা খাওয়াবো। আমি ওর কোনো কথায় না বলতাম না। তবে শেষমেষ বিলটা আমিই দিতাম। কেনো দিতাম, বলতে পারবো না। আমার কাছে ১০টি টাকা থাকলে সেটাও ওর পেছনে খরচ করতে ভালো লাগতো। আমার চাকরী আছে, বেতন পাই এমন কথা বলে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতো। এই চাকরীর চেয়ে ভালো চাকরী দিয়ে দেবে এমনটা বলতো। আসলে ও-ও যেনো বুঝে গিয়েছিলো, আমি ওর কোনো কথায় রাগ করবো না। স্বাধীনভাবে বলতো। আক্রমণাত্মকভাবে বলতো। আমি উপভোগ করতাম। আমাকে গ্রামে দাওয়াত করলো। বললাম- যাবো একদিন। আগামী কাল আবারও দেখা হচ্ছে তো? শহরে আসেন, বলে ফিরে গেলো গ্রামের বাড়িতে। অনেক পুরাতন জায়গাগুলোতে ঘুরলাম দুজন পরের দিন। ছবি তুললাম। ইসলামকেও খুঁজে বের করলাম রাধানগর মক্তবপাড়ায়। রিক্সায় সময় কাটালাম। খেলাম। ফোন নম্বর, বাসার ঠিকানা বিনিময় শেষে বিদায় নিলাম।
ঈশ্বর আর পিতা-মাতায় কী পার্থক্য? ঈশ্বর বান্দার জন্য বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। আর পিতা নিজে পরিশ্রম করে সন্তানের জন্য খাবার সংগ্রহ করে মুখে তুলে দেন। ঈশ্বর খায় না, ঘুমায় না। আর পিতা-মাতা সন্তান না খেলে খায় না, না ঘুমালে ঘুমায় না। তাই বুঝি ঈশ্বরকে সনাতন ধর্মে মা এবং খৃষ্টীয় ধর্মে পিতা নামে ডাকা হয়েছে। যে সকল সন্তান নাবালক অবস্থায় পিতা হারায়, তারা কি ঈশ্বরহীন হয়ে যায়! ঈশ্বর এতিমের দায়িত্ব যাদের উপর অর্পন করেছেন, তারা বরং এতিমের জন্য আরও সমূহ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে থাকে। এতিমের সম্পদ রক্ষার অজুহাতে দিনে পর দিন, বছরের পর বছর এবং এমন কি পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত সে সম্পদ ভোগ দখল করে যায়। সম্পদের প্রকৃত মালিক এতিমকে এতোটাই হেয় করে তোলা হয় যে, আত্ম-মর্যাদা রক্ষার জন্য তাকে সম্পদের মায়া-ই ছেড়ে দিতে হয়। পিতা না থাকতে একাধিক মায়ের সন্তানদের ক্ষেত্রে আরও ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়। একই নদীর দু’রকম জলের মতো। তবে প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় ছোটো মায়ের সন্তানেরা ভূক্তভোগী হয় বেশি। চাচা-কাকা ছাড়াও ও পক্ষের বড়ো’র প্রতি সম্মান দেখাতে দেখাতেই জীবন কেটে যায়। সে যে তাদেরই একজন, এটা প্রমান করতে সব সময়ই নিজেকে বিসর্জন দিতে হয়। সম্পদের অধিকার হয়ে যায় দান খয়রাতের বরাদ্দ। মানুষ দেখে বড়ো পরিবার, সম্পদের পাহাড়। কিন্তু জানতে পারে না ভিতরের খবর কোনোদিনই। বললেও কেউ বুঝতে পারে না। “কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কীসে, কভু আশীবিষে দংশেনি যারে” কবিতার এই পংক্তির মতোই। মির্জা তাহের জামিল এমন পরিস্থিতির শিকার নয়, কে বলতে পারে? কেউ পারবে না। বলবে- মিলে মিশে থাকতে হয়। আসলে তারা এক নদীতে প্রবাহিত দুটি ধারার জল যে কোনোদিনই মেশে না, সেটা বুঝার ক্ষমতা তাদের নেই। জলের গুনাগুন যারা জানে, তারা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো পথ পায় না। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক মুখে বলে বুঝানো যায় কি! আমরা হয়তো দেখি, দুটি ভাই অনবরত ঝগড়া করছে। আসলে ওটা ঝগড়া নয়। ওদের ভালোবাসা প্রকাশের ভাষা। ভালোবাসা আয়নার পারদ। নিজের ছবি দেখা যায় ভালোবাসার মানুষের চোখে। আমরা যাকে যেমন করে ভালোবাসি, সেও তেমন করেই ভালোবাসা। অন্যে তা বোঝে কি!
মির্জা তাহের জামিল দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার জন্যই যেনো গ্রামে ফিরেছিলো। কী দোষ ছিলো তার? মৃত্যুর সাথে দীর্ঘ লড়াই করে বাঁচতে হয় তাকে। একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যাক্তিকে কেউ যদি কুপিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে, পা দুটি ভেঙে দেয়। তার কি বাঁচার কথা! তবুও বেঁচেছিলো সে। তাকে সুস্থ্য করতে কতো কষ্টই না সয়েছিলো তার পরিবার। ওদের বাড়ি যাওয়ার চেষ্টায় মোসতাফা সতেজের মুখে জানতে পারি জামিলের ছোটো ভাই মির্জা রানার কথা। সতেজ ভাই-ই রানাকে তার অফিসে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দেন। পরের দিনই গ্রামে গিয়েছিলাম। আমাকে পেয়ে চঞ্চল হয়ে উঠেছিলো সে। আপ্যায়ন করানোর জন্য খুব ব্যস্ত। নিজে চলতে পারে না। খালাম্মাকে ডেকে এটা, ওটা, সেটা রান্না করতে বলে। আমি ওকে শান্ত হতে বলি। খালাম্মা অনেক কিছু রান্না করে খাইয়েছিলেন। জানতে পারি কী ভয়াবহ জীবন-যাপন করছে সে। বাথরুমে পর্যন্ত যেতে পারতো না। খালাম্মার অসহায়ত্ব বর্ণনাতীত। আমি ওকে বলেছিলাম- মা ছিলো, তাই বেঁচে গেলেন। বৌ থাকলে এই সেবা সে করতো না, বরং আপনাকে ছেড়ে পালিয়ে যেতো।’ মির্জা রানা-ও সে সময় গ্রামে থাকতেন। ওর সাথে পরিচয় না থাকার কারণ হলো, মির্জার সাথে তাকে কোনোদিন দেখি নি। অন্য কারণ- আমি ১৯৯৩ সালে পাবনা ছাড়ি। পাবনায় দীর্ঘকাল অনুপস্থিত থাকার কারণে এই সময়ের মাঝে যারাই লেখালেখিতে অগ্রসর হয়েছেন, তারা সবাই আমার অচেনা। মির্জা রানা নতুন লেখকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কাজটি করছেন আজকাল। মজার ব্যাপার কী, আমি যেমন চাইতাম জামিলকে খাওয়াতে, ওর সব ঠাঁট শুনতে- মির্জা রানার সাথে হচ্ছে ঠিক তার উল্টো- ও চায় আমাকে খাওয়াতে, আমার চাওয়া পূরণ করতে। কোনোবারই না খাইয়ে ছাড়ে না। অদ্ভূত, তাই না? এটাই কি কর্মফল? জামিলের সাথে আমার কেমন সম্পর্ক বা তার গভীরতা কতটুকু তা নিয়ে রানার সাথে কোনোদিনও আলোচনা হয় নি। আমিও রানা সম্পর্কে সামান্যই জানি। অথচ, আমার কাছে মনে হয়, ওর কাছে আমি যেনো মির্জা তাহের জামিল, আর ও হয়েছে সাগর আল হেলাল। জানি না এ কথাটি ও যখন জানবে, তখন সে কী ভাববে!
মির্জা যখন মোটামুটি সুস্থ্য। ঢাকাতে আমার বাসায় মাসখানেক অবস্থান করেছিলো। আমার আগ্রহেই গিয়েছিলো ও। এ সময় তার মধ্যে বিশেষ কিছু পরিবর্তন দেখেছিলাম। হঠাৎ একরাতে বললো-‘আমি যখনই বিপদের মধ্যে পড়ি, তখনই আপনার কাছে আসি- তাই না? আমি যখন ভালো ছিলাম, আপনি কেমন আছেন তার কোনো খোঁজ-খবর নিই নি।” আমি রাগ করি। এতোটাই যদি মনে হয়, তাহলে এলেন কেন? খলখল করে হেসে ওঠে। বলে- ‘আপনাকে চেক করলাম। পাশ করেছেন। বলেন, কী খাবেন?’ আমি ওর দিকে চেয়ে থাকি। মির্জা আমার চিন্তা ও লেখার সমালোচনা করতো খুব। আমি সেটা উপভোগও করতাম। আসলে সাহিত্যকর্মে সমালোচনার কাজটা বিশেষ জরুরী। তাহলে কী ও আমাকে লেখালেখির ক্ষেত্রে সচেতন রাখার কাজটি করেছে!
আজ মির্জা তাহের জামিল আমাদের মাঝে নেই। কি হবে তার কবরের পাশে বসে থেকে? কোনো লাভ হবে তার কবরকে সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিলে? আমার তা মনে হয় না। কবি সাহিত্যিকদের কবরের পাশে কেউ যায় না। যায় পীর আর রাজনৈতিক নেতার মাজারে। আমার মনে হয় মির্জা যতটুকু সাহিত্যকর্ম রেখে গেছে সেটাকেই অতি যতœ সহকারে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়াই হবে প্রকৃত কাজ। তাকে নিয়ে ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। লতিফ জোয়ার্দার, মোখলেস মুকুল, মির্জা রানাকে ধন্যবাদ। আমার কাছে দুটি লেখার জন্য অনুরোধ এসেছে, আমার সবটুকু সদিচ্ছা উজাড় করার চেষ্টা করেছি। যারা সাহিত্য চর্চা করে তাদের অধিকাংশই থাকে পরিবারের লোকেদের কাছে লাঞ্ছিত, মূল্যহীন অপদার্থ। পরিবারের অধিকাংশ মানুষই তাকে এবং তার বন্ধুদেরকে পছন্দ করে না। একজন সাহিত্যিকের সাথে আরেকজন সাহিত্যিকের সম্পর্ক পরকীয়ার মতো। সবকিছু হয় অতি গোপনে, সন্তর্পনে। সাহিত্যিকের প্রিয় জগত থাকে তার পরিবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পরিবারের কাছে একজন সাহিত্যিকের মননশীলতা থাকে সব সময় অনুপস্থিত। এজন্য প্রয়োজনে বিজ্ঞাপন দিয়ে মির্জা তাহের জামিল সম্পর্কে তার বন্ধু-সুহৃদ যিনি যা জানেন সে তথ্য সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। তার প্রকাশিত-অপ্রকাশিত লেখাগুলো সংগ্রহ করা। ও লিটল ম্যাগাজিনে লিখতো। লিটল ম্যাগাজিনগুলো সংগ্রহ করা। পত্রিকার বিশেষ এই সংখ্যাটিতেও তার লেখা গল্প সংযুক্ত করা। প্রকাশিত বইয়ের পুন:প্রকাশের ব্যবস্থা করা। তাহলেই তার ত্যাগ, তার পরিশ্রম, তার আত্মা প্রতিষ্ঠিত হবে।
মির্জা তাহের জামিলকে নক্ষত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সকলের।
0 মন্তব্যসমূহ