লজিং মাস্টার ৥ সাগর আল হেলাল

লজিং মাস্টার

৥ সাগর আল হেলাল

 

আমার প্রাইমারি স্কুলের নাম ৯৬ নং নলদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এটি সদর উপজেলায় এবং শহর থেকে ৮ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত।

লজিং মাস্টার বা হোম টিউটরকে এখন গৃহ শিক্ষক বলে। এখনকার গৃহ শিক্ষক গৃহে থাকেন না, গৃহে এসে পড়ান। সেদিক থেকে গৃহ শিক্ষক শব্দটা প্রকৃত অর্থ বহন করে না। আমার ছোটো বেলায় আমাদের বাড়িতে একজন গৃহ শিক্ষক থাকতেন। তখন তাকে কিন্তু গৃহ শিক্ষক বা হোম টিউটর বলা হতো না। গৃহে অবস্থান করেও ওনারা গৃহ শিক্ষক নামে খ্যাত হন নাই। ওনাকে বলা হতো জায়গীর মাস্টার।

সে যাই আমাদের বাড়িতে একজন মাস্টার জায়গীর থাকতেন। ওনার নাম ছিলো মোঃ কামাল হোসেন। আমরা বলতাম কামাল স্যার। ওনার বাড়ি ছিলো সাঁথিয়া থানায়। নতুন চাকরী পেয়ে পোস্টিং পেয়েছিলেন পাবনা সদর থানার নলদহ গ্রামে। নলদহ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি সবে মাত্রই সরকারি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রচুর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। আমাদের স্কুলে এক সময় দেখা গেলো শিক্ষক মণ্ডলীকে বসার জন্য চেয়ার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের সময় দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। তখন অবশ্য দুর্নীতি নামক শব্দের সাথে আমরা অবহিত ছিলাম না।

আমি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ি। দ্বিতীয় শ্রেণিতে তখন ভূগোল পড়ানো হতো। এ বিষয়টি যিনি পড়াতেন ওনার নাম ছিলো মোঃ শাহজাহান। আমরা শাহজাহান স্যার হিসেবে জানতাম। উনি চড় কষতেন হাত শক্ত করে। চোয়াল তিরতির করে উঠতো। ওনার মারার আরেকটি কৌশল ছিলো আঙ্গুলের ভিতর পেন্সিল দিয়ে চাপ দেয়া। খুব ব্যথা লাগতো।

আমার ফুফুর বাড়ি অন্য একজন শিক্ষক জায়গীর থাকতেন। ওনার নাম ছিলো মতিয়ার রহমান। কলম খুব শক্ত করে ধরে লিখতেন। লেখার সময় ওনার হাত কেমন দেখাতো, আজও চোখে ভাসে। আমি ওনার মতো করে স লিখি এখনো। ওনার কাছে পড়েছি বাংলা। ইংরেজি পড়াতেন মোঃ মতিউর রহমান বন্দের স্যার। অবশ্য পরে হয়ে যান আমার দুলাভাই। তবে বেশিদিন তিনি শিক্ষক ছিলেন না। বিএসসি পাশ করা মানুষটা রাজনীতি ভালোবেসে চাকরী ছেড়ে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। তবে তিনি ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ করেতে পারেন নি। সরকার থেকে ঐ বারের সকল চেয়ারম্যানের পদ শূণ্য করে দেয়া হয়েছিলো। তিনি আর চেয়ারম্যান হননি।

কামাল স্যারের হাতের লেখা ছিলো খুব সুন্দর। ইটালিক ফন্টে লিখতেন। আমার দাদাও লিখতে ইটালিক ফন্টে। আমার হাতের লেখার পেছনে ওনার অনেক পরিশ্রম ছিলো। ওনার পরিশ্রমটা যৌক্তিক ছিলো। কারণ, ওনার থাকার ঘর ছিলো বৈঠকখানা ঘর। যা বাড়ির বাহিরবাড়ি অতিক্রম করে যেতে হতো। ওনার সকাল ও রাতের খাবার আমি বহন করতাম। আমার লেট হলে, স্যারের খাওয়াও লেট হতো। স্যার আমার জন্য খাটতেন, সেটা আমি বুঝতাম। আর তাই রান্না হবার সাথে সাথে স্যারের খাবারের জন্য তাগাদা দিতাম বারবার। অনেক দিন খাবার দেরির কারণে স্যারের স্কুলে যাওয়া দেরি হয়ে যেতো। শিক্ষক মণ্ডলীরা গোল হয়ে বসতেন স্কুল মেঝের মাঝখানে। এক কক্ষের স্কুল। বেড়ার সাথে হেলান দিয়ে বসার সুবিধা রেখে বসার বেঞ্চ। আমরা স্যারদের কাজ, গল্প, হাসাহাসি দেখতাম যাত্রা প্যান্ডেলের চারপাশে বসা দর্শকের মতো। স্যার যেই চেয়ারে বসে থাকতেন, ঐ চেয়ার নিয়ে এসে আমাদের হাই বেঞ্চের সামনে এসে বসতেন ও পড়াতেন। গৃহে পড়ানোর মতো। ওনাদের সামনে আজকালের মতো কোনো টেবিল থাকতো না।

আমার আর একজন প্রাইমারি শিক্ষক ছিলেন, যার নাম মোঃ আবু ইউসুফ। আমার খাতায় তিনি অনেকবার আবু হেলাল লিখে দিয়েছেন। আমিও সখে সখে লিখতাম আবু হেলাল। যাই হোক গণিত কষাতেন জালাল স্যার। সকল শিক্ষকই তুই তুকারি করে কথা বলতেন। লাঠি হাতে নিয়ে স্কুল মাঠের ঘাসের ডগা ছেঁড়াতেন। কাজে ফাঁকি মানে, জোড়া বেতের বাড়ি। আমি জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পারতাম ভালো। পিটি করার সময় পতাকা উত্তোলন ও সামনে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া আমার প্রধান কাজ ছিলো। এ জন্য স্কুলে যেতে দেরি হয়ে গেলেও মার খেতে হতো। খেয়েছি, প্রাইমারি ছাত্র জীবনে- স্কুলে দেরি হওয়ার জন্য মার ভালোই খেয়েছি। স্কুলে যেতে দেরি হতো কেনো, সে বিষয়ে কামাল স্যার সাক্ষ্য দিলেও রেহাই পেতাম না। ভবিষ্যতে সুগোগ পেলে বলবো।

আমার সকল প্রাইমারি শিক্ষককে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই শিক্ষক দিবসে। ওনারাই আমাকে স্কুল থেকে বিদায়ের সময় যেই সনদপত্র দিয়েছিলেন, সেখানে রোল নম্বর ছিলো ১।

-

০৫.০৯.২০২২




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ