পাকিস্তান সেনাবাহিনীর রাজনীতিঃ একটি মূল্যায়ন

 


ভূমিকাঃ

দিন-রাত্রি, ভালো-মন্দ, সাধু-শয়তান চিরন্তন বিষয়। প্রতিটি মানুষের ভেতরেও মনুষ্যত্ব ও পশুত্ব সমভাবে বিরাজমান। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত এবং মানুষই চতুষ্পদ জন্তুর অধম। সাময়িক সুযোগ-সুবিধা, মান-সম্মান ইত্যাদিসহ ক্ষমতার মোহ মানুষকে মানুষ থেকে অমানুষ করে দেয়।

বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের বীজ রোপিত হয়েছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভের প্রাক্কালেই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম পাকিস্তান জন্মের হাত ধরে। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের নেতৃত্বই অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলো। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ একজন সৎ, নির্ভিক এবং ঝুঁকি গ্রহণের সাহসিকতা সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টি হলে সেখানকার মানুষ ভালো থাকবে কি না এমন প্রশ্নের মুখে ১০ বৎসর সময় বেঁধে দেয়া হয়। যদি ১০ বৎসরের মধ্যে পাকিস্তান স্বনির্ভর হতে না পারে, তাহলে তা আবার ভারতের সাথে একীভূত হবে। এমন শর্ত মেনেই সেদিন পকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিলো।

সেনা বাহিনীর রাজনীতিতে প্রবেশঃ

পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুহূর্তেই পাকিস্তান যখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরীতে ব্যস্ত ভারত কাশ্মিরকে তাদের অন্তর্ভূক্ত করার জন্য সৈন্য প্রেরণ করে। সে সময় পাঞ্জাব, গিলগিত বালতিস্তান এবং কাশ্মিরের বেসামরিক জনগণ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে নিজেদের অবস্থান এবং কাশ্মিরের কিয়দংশ রক্ষা করতে সমর্থ হয়। পরবর্তীতে আরও কয়েক দফা ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ হয়েছে। সামরিক বাহিনীর সাথে সাধারণ জনগণও এ সকল যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। পাকিস্তানের জনগণ সেনাবাহিনীর অংশ এমন ভাবনা থেকেই পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীতে রাজনীতি প্রবেশ করে। পাকিস্তানের জনগণও দেশের সার্বভৌত্বকে রক্ষার তাগিতে সেনাবাহিনী অনেক অবৈধ হস্তক্ষেপ বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছে যা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কল্পনাও করা যায় না।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনী পাকিস্তানের মালিক হয়ে যায় এভাবেই। পশ্চিম পাকিস্তানে অনাবাদী জমির পরিমাণ বেশি। পূর্ব পাকিস্তানের জমি উর্বর। সুতরাং খাজনা আদায় ভালোই হতে থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণও তখন নিজেদের সাময়িক সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে পূর্ব পাকিস্তানের অভাব-অনটন তথা সকল বৈষম্যের বিষয়ে মুখে তালা দিয়ে রেখেছে। আগেই বলেছি- পাঞ্জাব, খায়বার পখতুনখা, গিলগিত বালতিস্তান, আজাদ কাশ্মিরের জনগণ নিরস্ত্র নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ সশস্ত্র হলেও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ছিলো নিরস্ত্র এবং নেহায়েত সাদামাটা। নেহায়েত সাধারণ জনগণের উপর অত্যাচার করা তাই সেনাবাহিনীর জন্য অতি সহজ কাজ হয়ে গেছে। এই ফাঁকে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে তারা কুক্ষিগত করে নেয়। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণকে তারা বুঝায় যে, পূর্ব পাকিস্তান থেকে সেনাবাহিনী কামাই করে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণকে ভরণ পোষণ করছে। আর যায় কোথায়, কাঁথা মুড়ি দিয়ে পশ্চিমের জনগণ ঘুমিয়ে যায়। ভারত থেমে ছিলো না, ওদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বৈষম্যনীতিরও অবসান হচ্ছিলো না। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাসকে মাটি চাপা দিয়ে প্রথমে স্বায়ত্ব শাসন পরে স্বাধীনতার আন্দেলন শুরু করে। পশ্চিম পাকিস্তানের বোকা সেনাবাহিনী ভেবেছিলো আমেরিকা পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা হতে দেবে না। কিন্তু সেটাতো হবার নয়। তলা বিহীন ঝুড়ির পক্ষ কি আর আমেরিকা নেয়! অবশেষে যা হবার ছিলো, তাই হলো। আজকের বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আমরা এখন গর্বিত বাংলাদেশী

আর্মির রাজনীতির ধারাবাহিকতাঃ

পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ায় জুলফিকার আলী ভুট্টো বুঝেছিলো, তার সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। কারণ, সেনা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাকে বুঝানো হয়েছিলো- আমেরিকার সাপোর্ট আছে, তাকেই উভয় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করা হবে।  কিন্তু ফল হলো উল্টো। পাকিস্তান বিভাজনের দায়ও তার ক্ষমতা লিপ্সার উপর বর্তায়। আর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যেনো আরব সাগরে ডুব দিয়ে পবিত্র হয়ে যায়।

সঙ্গত কারণেই ভূট্টো ক্ষমতায় আসার জন্য সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসি আন্দোলন শুরু করে এবং দেশের অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে পরমাণু কর্মসূচি বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠে। এবার যেনো পাকিস্তানী জনগণের ঘুম ভাঙলো। ভূট্টোর  জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়, কাশ্মির হারানো পাঠানদের সমর্থন লাভ করে এবং ক্ষমতায় আসীন হয়। সেনা বাহিনীর ক্ষমতা জনগণের হাতে চলে যাওয়ায় পাক আর্মির খুব গোস্বা হয়। আরম্ভ হয় প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। সেনাবাহিনী বুঝতে পারে- নিজেদের হাতে ক্ষমতা রাখতে হলে, পাঠানদেরকে পক্ষে রাখতে হবে। তারা এমন একজন লোক অনুসন্ধান করছিলো- যাকে কাশ্মিরী, পাঞ্জাবী, পখতুন সবাই গ্রহণ করে। কাশ্মিরী বংশোদ্ভূত শরীফ পরিবার তাদের সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অংশীদার হয়ে সামনে দাঁড়ায়। সেনাবাহিনী শরীফ পরিবারকে দত্তক নিয়ে ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেয়ার পরিকল্পনায় নামে। জিয়াউল হক খুব সুন্দরভাবেই কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। সম্প্রতি একটি আলোচনায় শুনলাম, জিয়াউল হককে দেখতে নাকি খুবই অনুগত মনে হতো। আসলে, কুকুরইতো মালিক ভক্ত হয় বেশি। ৯০ এর দশকের পর থেকে পৃথিবী ব্যাপী সামরিক শাসনের বিষয়ে প্রতিবাদ ওঠে। পাকিস্তানে সামরিক শাসন থাকায় তারা সমালোচিত হয়। এক পর্যায়ে জিয়াউল হক বিমান দুর্ঘটনায় মারা (?) যায়।

ইমরান খানকে কেনো ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়েছিলোঃ 

ইমরান খানকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়েছে কেবল ক্ষমতার পালাবদল দেখানোর জন্য। জেনারেল বাজওয়া জানতেন নওয়াজ শরীফের দল ভোট পাবে না। ব্যাপক ভোট কারচুপির মাধ্যমে তাকে ক্ষমতায় আনলে জনগণ মানবে না। তাই বিকল্প পন্থায় নওয়াজ শরীফকে পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা করা হয়। সংসদীয় আসনগুলোর ফলাফল নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে এমনভাবে সাজানো হয় যেনো ইমরান খানের বিপক্ষে নো কন্ফিডেন্স ভোট করা যায়। সুতরাং বলা যায় এখন পাকিস্তানে যা হচ্ছে ২০১৮ সালের আগেই এর পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। ইমরান খানকে সেই পরিকল্পনার মোহরা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের বিশ্বাস ছিলো, ইমরান খান কোনো কাজ করতে পারবে না। অল্পদিনেই তাকে অযোগ্য প্রমাণিত করে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতায় বসাবে। জেনারেল বাজওয়ার পক্ষ থেকে ইমরান খানের উপর যে সকল বিষয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে তার তালিকা দেখলে এর সত্যতার প্রমাণ প্রতিটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় ইমরান খান সকল চাপ উপেক্ষা করে দেশকে একটি সঠিক পথে চালিত করতে সমর্থ হয়।

বৈশ্বিক পরিবর্তনের সাথে সাথে রাজনীতিতেও নানা শ্রেণি পেশার মানুষের আগমণ ঘটতে থাকে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এ সময় রাজনৈতিক দল পিটিআই প্রতিষ্ঠা করে। আরম্ভ হয় জুলফিকার আলী ভূট্টোর রেখে যাওয়া সিভিলিয়ান সুপরিমেসি আন্দোলনের নতুন যাত্রা আরম্ভ হয়। দীর্ঘ ২২ বছর রাজনৈতিক সংঘর্ষের পর ২০১৮ সালে ইমরান খান ক্ষমতায় আসেন। লোকেরা বলে থাকেন, ইমরান খানের ক্ষমতায় আসার পেছনে পাকিস্তানী আর্মির সমর্থন ছিলো। আমার কাছেও তাই-ই মনে হয়েছে। তবে তাদের এই সমর্থন যে একটি চাল ছিলো, পরবর্তী সময়ে তা প্রমাণিত হয় ২০২২ এর ৯ এপ্রিল থেকে ধারাবাহিকভাবে। মূল ক্ষমতাটা আসলে জেনারেল বাজওয়ার হাতে ছিলো। যার প্রমাণ প্রথম দিনই দেখতে পাওয়া যায়। কারতারপুর করিডোর খোলা হবে তার ঘোষণা সেনা বাহিনীর জেনারেলের দেয়া কথা নয়। এমন পদক্ষেপ কেবল একজন সরকার বা রাষ্ট্র প্রধানই করতে পারেন। আসলে জেনারেল বাজওয়া প্রথম দিনই সারা পৃথিবীকে দেখিয়েছিলেন- মূল ক্ষমতা তার হাতে। পরবর্তীতে সৌদি, ইউএইসহ মধ্যপ্রাচ্যের যতোগুলো রাষ্ট্রে ইমরান খান গিয়েছিলেন- প্রতিটি সফরেই ওনার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়েছে ইমরান খানকে। পাঞ্জাব বা পখতুনখোয়ায় চীফ মিনিস্টার বাজওয়া পছন্দের লোক বসাতে চেয়েছিলেন কেবল ইমরান খানকে অকার্যকর প্রধানমন্ত্রী প্রমানের জন্য। কিন্তু ইমরান খানের ধৈর্যের কাছে তাকে হার মানতে হয়। এভাবে ইমরান খানকে অজনপ্রিয় করতে ব্যর্থ হয়ে বিকল্প পরিকল্পনা আরম্ভ হয়।

ফজলুর রহমান, টিএলপি কে মাঠে নামানো হয়। তারা লংমার্চসহ জনগণের সম্পদ নষ্টের কাজে লিপ্ত হলেও ইমরান খান খুবই ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি সামালে নেন। ফজলুর রহমান প্রকাশ্যে বলেছে- জেনারেল বাজওয়ার কথা মতো সে লং মার্চ করেছে। আইএসপিআর থেকে এর কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। বিলাবল, মরিয়ম তারাও লংমার্চ করেছে। আর্মি ভেবেছিলো ইমরান খানের সরকার টিকবে না। কিন্তু এ সব লংমার্চ জন সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়। ইমরান সরকার বেঁচে যায়।

পাকিস্তানের সংবিধান এমনভাবে রচিত যে, সেখানে সেনা বাহিনীর ক্ষমতা অপরিসীম। তারা সব সময় থেকেছে আইনের উর্দ্ধে। আজও। দীর্ঘ ৭৪ বছর ধরে তাদেরই হাতে ক্ষমতা। পৃথিবীর সবাইকে ধোকা দেবার জন্য ২/১ বছরের জন্য ক্ষমতা ছাড়লেও নিয়ন্ত্রণ কখনোই ছাড়েনি। এ কাজে আইএসআইকে খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আইএসআই এর ভয়ে সাংবাদিক, বিচারক, এমন কি রাজনীতিবিদরাও আর্মির বিপক্ষে টুঁ শব্দটি করে না। বাংলাদেশের উপর পাক আর্মি যেই নিপীড়ন চালিয়েছিলো, তা আজ চলছে তার নিজের ঘরের মানুষের উপর।

জেনারেল বাজওয়া ২০১৯ সাল থেকে শুরু করেন ২য় প্রক্রিয়া। ফজলুর রহমান, বিলাওল, মারিয়ামের লংমার্চ এর মাধ্যমে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করা হয়। এর সবই হচ্ছিলো জেনারেল বাজওয়ার নির্দেশে এবং তত্তাবধানে। কিন্তু এবার আল্লাহ পাক করোনা পাঠিয়ে ইমরান খানকে রক্ষা করে। করোনার ভেতর দিয়ে ইমরান খানের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশ আরও এগিয়ে যাচ্ছিলো। জেনারেল বাজওয়া তাই সরাসরি মাঠে নামেন। ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়ম ভঙ্গ করে নতুন আইএসআই নিয়োগ দেন। এবার তিনি সফল হন। দ্বন্দ সামনে এসে যায়। আইএসআই ইমরান খানের শেঁকড় কাটতে থাকে।

পাকিস্তানী আর্মি ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার জন্য সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন এবং ন্যাবকে ব্যবহার করে। ন্যাব হলো ধোলাই মেশিন। সেনাবাহিনীর পক্ষে না এলে এখানে তাকে ওয়াশ করা হয়। আইএসআই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সৃষ্টি করে। অভিযোগ সৃষ্টি, বিচার প্রক্রিয়া সবই হয় সুনিয়ন্ত্রিত পন্থায়। সেখানে যাবজ্জীবন জেলও কোনো সমস্যা নয়। সেনাবাহিনীর এজেন্ডা মতো চললে মুক্ত হতে একটি রাতই যথেষ্ঠ। যার প্রমাণ পরবর্তীতে পাওয়া য়ায়।

আমেরিকান সাইফার জেনারেল বাজওয়া কর্তৃক রচিত। আমেরিকাকে জেনারেল বাজওয়া বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলো যে, সাইফার গোপন থাকবে। এটা শুধু ইমরান খানকে সরানোর জন্য ব্যবহার করা হবে না। কিন্তু ইমরান খান কৌশল করে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মিটিং রেজুলেশন করে সাইফার সামনে নিয়ে আসে। জেনারেল বাজওয়া অনেক চেষ্টা করেছিলো এটাকে ধামা চাপা দিতে। সাইফার এখনো গোপন রাখা হয়েছে বাজওয়ার চাপে। কিন্তু ইমরান খান কৌশল করে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সভা আহবান করেন এবং এটাকে অফিয়াল করে দেন। এ জন্যই আইএসআই এর মাধ্যমে ইমরান খান, তার কর্মী এবং যে সকল সাংবাদিক সাইফারের বিষয়ে কথা বলেছেন তাদের উপর এতো অত্যাচার। আমার মনে হয়, এ অত্যাচার অব্যহত থাকবে।

বর্তমান অবস্থাঃ

জেনারেল বাজওয়া, নওয়াজ শরীফ এবং আমেরিকান ফরেন অফিসের সমন্বয়ে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। পাকিস্তানে রেওয়াত ছিলো যে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতা থেকে নামালে সাধারণ মানুষ মিষ্টিমুখ করতো। কিন্তু ইমরান খানের ক্ষেত্রে ঘটলো এর বিপরীত। পিডিএম মিষ্টিমুখ করলেও সাধারণ মানুষ ইমরান খানের পক্ষে রাজপথে নেমে আসে। ইমরান খানের জন সমর্থন কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে থাকে। যেমন-

১) পিটিআই নেতা কর্মী ক্রয় করার চেষ্টা করা হয়।

২) ইমরান খানের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়।

৩) এক এর পর এক এফআইআর দায়ের করা হয়। সম্ভবত ২৪ এর অধিক।

৪) বাছাই করা নির্বাচনী এলাকার পদত্যাগ গ্রহণ করে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়।

৫) পাঞ্জাব সরকারের পতন ঘটিয়ে দেয়া হয়।

৬) বাওয়ার বিপক্ষে ট্যুইট করায় সিনেটরকে উল্ঙ্গ করে ভিডিও করা হয়।

৭) জেনারেল বাজওয়ার বিপক্ষে কথা বলায় সাংবাদিক আরশাদ শরীফকে হত্যা করা হয়।

৮) ইমরান খানের ভাষণ টেলিভিশনে দেখানোয় টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হয়।

৯) ইমরান খানের বক্তব্য টিভিতে দেখানো বন্ধ।

১০) ইমরান খানকে হত্যার প্রচেষ্টা।

১১) নির্বাচন কমিশনের বৈষম্যমূলক আচরণ।

১২) আদালত থেকে ন্যায় বিচার না পাওয়া।

১৩) আইএসপিআর/আইএসআই কর্তৃক একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত সংবাদ সম্মেলন।

১৪) ইমরান খানের লংমার্চ যেনো না হয়, তার ব্যবস্থা গ্রহণ।

১৫) পিডিএম এর সকল পদক্ষেপকে অন্ধ সমর্থন।

১৬) এমন আরও অনেক আছে যা আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাবে শর্তে সংক্ষিপ্ত করা হলো।

এ সবই করা হচ্ছে বা হয়েছে ইমরান খানকে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে বের করে নওয়াজ শরীফকে পুনরায় ক্ষমতায় আনা। দীর্ঘ আট মাস অতিক্রম হলেও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হন জেনারেল বাজওয়া। কিন্তু এরই মধ্যে এসে যায় জেনারেল বাজওয়ার অবসরের সময়। বাজওয়া এখন জনগণের মধ্যে খুবই সমালোচিত হচ্ছে। কারণ ইমরান খানের বিরুদ্ধে তিনি যে সকল কাজ-কর্ম করেছেন বা করছেন সবই জনগণের সামনে এসে গেছে। এমন অবস্থায় যদি পুনরায় এক্সটেনশন নেন তাহলে পৃথিবী জুড়ে সমালোচিত হবেন। কারণ তিনি এরই মধ্যে অতিরিক্ত ৩ বছর এক্সটেনশন গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমেরিকান ফরেন অফিস এবং নওয়াজ শরীফ নিশ্চিত হতে পারছেন না যে, বাজওয়া অবসরে গেলে যিনি আসবেন তিনি ইমরান খানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। নতুন সেনা প্রধান নিয়োগে এখানেই প্রধান বাধা। এদিকে সিনিয়রিটি পাওয়ার পরও যাদের সেনা প্রধান হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তারাও মুখ খুলছে না বা গ্যারান্টি দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। কারণ জন সমর্থনকে নিয়ন্ত্রণ করা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। গণজোয়ারকে কোনো কালেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এ কারণেই ইমরান খানকে হত্যা করার জন্য আক্রমন করার সম্ভাবনা তাই কোনোভাবেই শেষ হচ্ছে না।

আইএসআই প্রধান, আইএসপিআর বাজওয়াকে সরাসরি সমর্থন দেখা গেলেও অন্যান্য জেনারেলদের মনোভাব বাইরে আসার কোনো উপায় নেই। কারণ পাকিস্তানে সেনা প্রধানের যেই স্ট্যাটাস, যে কারো এ পদে আসার স্বপ্ন থাকতেই পারে। আর সে জন্যই তারা মুখে কলুপ এঁটে বসে আছে। বাজওয়া চাইছেন, এমন কোনো জেনারেল এগিয়ে এসে বলুক- সে ইমরান খানকে আটকাবে। এমন কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না বলেই ডেড লক খুলছে না।

অসমাপ্ত পরিকল্পনাঃ

জেনারেল বাজওয়া এক্সটেনশন নেবেন। সরকার ২০২৩ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হবে। এর মধ্যে ইমরান খানকে হত্যা বা জন বিচ্ছিন্ন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। পিটিআই এর প্রথম সারির নেতাদেরকে ইমরান খানের বিপক্ষে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হবে। পাঞ্জাব সরকারের বিরুদ্ধে ক্যু করা। পারভেজ এলাহী যেনো বিদ্রোহ করে, তার পথ সৃষ্টি করা। ২০২৩ এর নির্বাচনে নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতায় বসিয়ে তারপর বাজওয়া অবসর নেবেন। ততোদিনে সিনিয়র জেনারেলের অনেকেই অবসরে চলে যাবেন। বাজওয়া সাহেব নাদিম আনজুমকে সেনা প্রধান নিয়োগ দিয়ে বিদায় নেবেন। নাদিম আনজুম সেনা প্রধান হয়ে এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন যেনো ইমরান খানের সামনে রাজনীতি থেকে অবসর নেয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা না থাকে।

কেনো সেনা প্রধান ইমরান খানের বিপক্ষেঃ

সেনাবাহিনীর পেছন থেকে জনগণ সরে গেলে কী হয় সে প্রমাণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ সেনা বাহিনীর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলো। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর প্রধান স্লোগানও ছিলো মুক্তির সংগ্রাম। সেই মুক্তির সংগ্রামই স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ পরিগ্রহ করেছিলো। এখানে ভৌগলিক কারণে বড়ো ধরণের ম্যাসাকার বা যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা ব্যাহত হয়। পাকিস্তানে যদি এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় তাহলে সে যুদ্ধ সহজে শেষ হবে না। পখতুনদের আফগানিস্তানে ৪০ বছরের যুদ্ধ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইমরান খান জন সচেতনতা এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, খানের বিরুদ্ধে যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করার সাথে সাথে কেউ না কেউ, কোনো বা কোনো স্থান থেকে সেই পদক্ষেপের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ইমরান খানকে যদি ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়, তাহলে অমেরিকান ফরেন অফিস, নওয়াজ শরীফসহ যারা সেনা বাহিনীকে উলঙ্গ সমর্থন করছেন তাদের সামনে সেনা বাহিনী ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়ে যাবে। এ ছাড়া, ইমরান খানে সিভিলিয়ান সুপ্রিমেসির বিষয়ে কি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে সে আশঙ্কাতো আছেই। পাকিস্তানের বর্তমান শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পরিবর্তনেরও সম্ভাবনা রয়েছে।

শেষকথাঃ

বাংলাদেশের একজন জেনারেল বলেছিলেন- সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। পাকিস্তানের জনগণই পারে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে। ইমরান খান জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়েছেন। হয় মুক্তি নয় মৃত্যু। তিনি সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণও হতে সক্ষম হয়েছেন। এখন পর্যন্ত জনগণ ইমরান খানের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে সম্পৃক্ত রয়েছে। কী হয়, তা দেখার প্রতীক্ষায় সারা বিশ্ব। গণতন্ত্রকে জয়ী দেখার প্রত্যাশায় ইমরান খানের জন্য শুভ কামনা।

-

সমাপ্ত

 

সাগর হেলাল

কলামিস্ট

১৭.১১.২০২২

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ